ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য ও মৈত্রেয়ীর উপাখ্যান

0

নারী ঋষি মৈত্রেয়ীর উপাখ্যান

যাজ্ঞবল্ক্য নামে এক বিখ্যাত ঋষির পত্নী ছিলেন মৈত্রেয়ী । তাঁর আরেক পত্নী ছিল । তার নাম ছিল কাত্যায়নী । মৈত্রেয়ী ছিলেন ধর্মশীলা । স্বামীর মতাে তিনিও ধ্যান ও ধারণাতেই বিশেষভাবে সময় অতিবাহিত করতেন, স্বামীর সঙ্গে ব্রহ্মবিদ্যা আলােচনায় তিনি আনন্দ লাভ করতেন । অপর দিকে কাত্যায়নী ছিলেন গৃহধর্মপরায়ণা । স্বামী সেবাকেই তিনি ধ্যান জ্ঞান মনে করতেন । গৃহস্থাশ্রমেই যাজ্ঞবল্ক্যের জীবন অতিবাহিত হচ্ছিল । এক দিন তিনি ভাবলেন, শাস্ত্র নির্দেশে তাঁর বানপ্রস্থ গ্রহণ করার বয়স হয়েছে । সংসার বন্ধন ছিন্ন করে তিনি বানপ্রস্থ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহােদরার ন্যায় সুখে শান্তিতে এই আশ্রমেই থাকবে ।


নারী ঋষি মৈত্রেয়ীর উপাখ্যান

স্বামীর ধর্মাচরণে বাধা দেওয়া কোন স্ত্রীর কর্তব্য নয় বিবেচনা করে মৈত্রেয়ী ও কাত্যায়নী উভয়েই মৌন হয়ে রইলেন । তখন যাজ্ঞবল্ক্য খুশি হয়ে বললেন, ‘এবার তাহলে আশ্রমের সমস্ত সম্পত্তি তােমাদের মধ্যে ভাগ করে দিতে চাই । যদি কোনাে কারণে আমার অনুপস্থিতিতে তােমাদের মধ্যে মনের বা মতের অমিল দেখা দেয় এবং এই সম্পত্তি, নিয়ে ঝগড়া বাধে ।'

উত্তরে মৈত্রেয়ী বললেন, ‘ভগবান, আপনি যে ধন সম্পত্তির কথা বলছেন সে বিষয়ে আমার কিছু জিজ্ঞাসা আছে । শুধু আপনার আশ্রমের ধন সম্পদ কেন, এই সমুদ্র-মেঘলা সমগ্র পৃথিবী যদি ধন ধান্যে পরিপূর্ণ হয় এবং আমার হয় তবে কি আমি সে সমুদয় দিয়ে অমৃতত্ব লাভ করতে পারব ? এই ধন সম্পদ দিয়ে বহুবিধ যজ্ঞক্রিয়াদি করলেই কি আমি অমর হতে পারব ?

মৈত্রেয়ীর প্রশ্ন শুনে যাজ্ঞবল্ক্য অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে উত্তর দিলেন, ‘মৈত্রেয়ী, তাও কি কখন হয় ? বিত্তের দ্বারা কখনও অমৃতত্ব লাভ করা যায় না, বরং ধন-সম্পদ অনেক সময় অমৃতত্ব সাধনায় বিঘ্ন উৎপাদন করে । তবে হ্যা, জগতে বিত্তশালী ব্যক্তিরা যেমন অভাব অনটন থেকে মুক্ত হয়ে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য ভােগ করে, তুমিও তা পারবে ।

মৈত্রেয়ী স্বামীর উত্তর শ্রবণ করে নিতান্ত বিমর্ষ বদনে বললেন, “যেনাহং নামৃতা স্যাং কিমহং তেন কুর্যাম্”-অর্থাৎ যা দিয়ে আমি অমৃতত্ব লাভ করতে পারব না, তা দিয়ে আমি কী করব ? এই অসার ধন সম্পদ দিয়ে আমার কী হবে ? হে ভগবান, আপনি যে ধন লাভ করে এই বিষয়-সম্পত্তি পরিত্যাগ করেছেন, আপনি যে জ্ঞানে জ্ঞানী হয়েছেন, দয়া করে আমাকে সে সম্বন্ধে উপদেশ দিন, আমাকে অমৃতত্ব লাভের সন্ধান দিন ।”

ধন সম্পদে মৈত্রেয়ীর নির্লোভ এবং অমৃতত্ব সাধনে উৎসাহ দেখে ব্রহ্মজ্ঞ ঋষি অত্যন্ত প্রীতিপূর্ণভাবে বলতে লাগলেন, ‘পতি যে পত্নীর প্রিয় হয়, তার কারণ হল—পতিকে ভালােবেসে পত্নীর আত্মা সুখী হয় । পুত্র কন্যাকে স্নেহ করে বাৎসল্য রসে পিতা-মাতা আত্মিক সুখ অনুভব করেন, এ জন্যই সন্তান সন্ততিও পিতা-মাতার স্নেহে নিজ নিজ আত্মিক সুখ অনুভব করে । তাই সন্তান সন্ততি পিতা-মাতার প্রতি অনুরক্ত থাকে । ধনের নিমিত্তই ধন লােকের প্রিয় হয় না, নিজ প্রয়ােজন সিদ্ধির জন্যই ধন লােকের প্রিয় হয়ে থাকে । পতি বল, পুত্র বল, পত্নী বল আর বিত্ত বল, এমন কি স্বর্গ বা দেবতাদের কথাই বল সব কিছুই নিজ নিজ আত্মার প্রীতির জন্যই লােকের প্রিয় হয়ে থাকে। তাহলে মূল কথা হল আত্মাই মানুষের মুখ্য প্রীতির বস্তু ।

এছাড়া ধন, জন, বিত্ত, স্বর্গ-সব কিছুই গৌণ ।

ব্ৰহ্মর্ষি যাজ্ঞবন্ধ্যের উপদেশসুধা আকণ্ঠ পান করে মৈত্রেয়ী তৃপ্ত হলেন । তিনি উপলব্ধি করলেন অমৃতের সাগর দূরে নয়; তা অতি নিকটে, একেবারে তার অন্তরের অন্তরে। তার আত্মাই পরম অমৃত । মৈত্রেয়ী অমৃতের সন্ধান পেলেন ।


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
Post a Comment (0)
To Top