গীতার ১৮টি নামের কারণ ও মাহাত্ম্য

0
গীতার ১৮টি নামের কারণ ও মাহাত্ম্য

Table Of Content (toc)

গীতার ১৮টি নামের কারণ ও ব্যাখ্যা

১. গঙ্গা

গঙ্গাস্নান যেমন মানুষকে পবিত্র করে, তেমনি গীতাও আমাদের মনকে পবিত্র করে বলে গঙ্গা, গীতার অপর একটি নাম ।

২. গীতা

গীতার পূর্ণনাম ভগবদগীতা, যার অর্থ ভগবানের গান; ভগবদগীতার সংক্ষিপ্ত বা ডাকনাম হিসেবে গীতা শব্দটি ব্যবহৃত ।

৩. সাবিত্রী

সনাতনী নারীদের জন্য পরম আদর্শ হলেন সাবিত্রী, যিনি চরম সতীত্বের প্রতীক, যিনি তার সতীত্বের জোরে মৃত স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে এনেছিলেন । সেই নারীকে সম্মানিত ক'রে সেই নারীর আদর্শে সকল নারীকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই শ্রীকৃষ্ণ গীতার একটি নাম রেখেছেন সাবিত্রী ।

৪. সীতা

দেবী সীতাও সাবিত্রীর মতো হিন্দু নারীদের জন্য আদর্শ, যিনি রাবনের বহু প্রলোভনেও তার সতীত্ব ত্যাগ করেন নি, সেই নারীকে সম্মানিত করে হিন্দু নারীদের হৃদয়ে তার আদর্শকে জাগরুক রাখতেই শ্রীকৃষ্ণ, গীতার একটি নাম দিয়েছেন সীতা ।

৫. সত্যা

পরমসত্য পরমেশ্বরের কথা এতে বলা হয়েছে বলেই স্ত্রীলিঙ্গে গীতার অপর একটি নাম সত্যা ।

৬. পতিব্রতা

শ্রীকৃষ্ণ হলেন জগতের পিতা, আর গীতামাহাত্ম্যে শ্রীকৃষ্ণ এটাও বলেছেন যে গীতাই আমার হৃদয়, ঠিক যেমন একজন প্রেমিক পুরুষ তার প্রেয়সীকে বলে যে তুমিই আমার- মন, প্রাণ, হৃদয় সব । গীতামাহাত্ম্যে শ্রীকৃষ্ণ এটাও বলেছেন যে- গীতাই আমার পরম আশ্রয় বা গীতাই আমার পরম গৃহ, যেমন একজন পুরুষ, তার প্রিয় নারীর মধ্যে খুঁজে পায় তার পরম আশ্রয় । এই সূত্রে একজন পতিব্রতা নারীর ভূমিকা তার স্বামীর জন্য যেমন, ঠিক গীতার ভূমিকাও শ্রীকৃষ্ণের জন্য তেমন; যেকারণে শ্রীকৃষ্ণ নিজেই স্বীকার করেছেন যে গীতা আমার পরমগুরু; এই প্রেক্ষাপটেই গীতার একটি নাম পতিব্রতা ।


আরো জানুনঃ জন্ম সংবাদ শুনলে যে মন্ত্র বলবেন!

৭. ব্রহ্মাবলি

এর মধ্যে দুটো শব্দ আছে, ব্রহ্মা ও বলি; ব্রহ্মা হলেন ঈশ্বরের সৃষ্টিকারী রূপের নাম, আর বলি শব্দের অর্থ হলো শক্তিমান, যা বল থেকে উদ্ভূত । তাই ব্রহ্মাবলি শব্দের অর্থ ব্রহ্মারশক্তি, যা সৃষ্টির শক্তিকে বোঝায় । যে কারণে শ্রীকৃষ্ণ গীতা মাহাত্ম্যেই বলেছেন- গীতার জ্ঞান আশ্রয় করিয়াই আমি ত্রিভুবন পালন করি, আর পালন করার পূর্বে তাকে সৃষ্টি করতে হয়, এই সৃষ্টির শক্তি বা জ্ঞান গীতাতে রয়েছে বলেই গীতার একটি নাম ব্রহ্মাবলি ।

৮. ব্রহ্মবিদ্যা

গীতার জ্ঞান মানুষকে ঈশ্বর বা ব্রহ্মকে জানতে ও বুঝতে সাহায্য করে, তাই এর একটি নাম ব্রহ্মবিদ্যা ।

৯. ত্রিসন্ধ্যা

ত্রিসন্ধ্যা অর্থ তিন বেলা । সূর্যোদয়ের পূর্বমূহুর্ত, দুপুরে স্নানের পর এবং সূর্যাস্তের পর । একজন মানুষকে তার জাগতিক কল্যান ও পরকালের মঙ্গলের জন্য প্রতিদিন এই তিন সময় বা তিনবার ঈশ্বরকে গীতার মাধ্যমে স্মরণ করতে হবে, এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেই গীতার একটি নাম ত্রিসন্ধ্যা ।

১০. মুক্তিগেহিনী

এখানে দুটি শব্দ আছে মুক্তি আর গেহিনী, মুক্তি মানে আমরা সবাই জানি । গেহিনী শব্দটি গৃহিণী শব্দের অনুরূপ, আর গৃহিণী মানে যাকে গ্রহণ করা হয়, যার অন্য অর্থ হলো স্ত্রী । এভাবে মুক্তিগেহিণী মানে মুক্তিদাতা নয়, মুক্তিগ্রহিতা । যদিও ঈশ্বরের কাছে আমরা জন্মান্তরসহ বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি চাই এবং ঈশ্বরকে মনে করি মুক্তিদাতা; কিন্তু আমরা মুক্তি পাবো কি না, সেটা নির্ভর করে আমাদের নিজেদের কর্মের উপর, অর্থাৎ মুক্তিকে আমাদেরকে গ্রহণ করতে হয়, তাহলেই ঈশ্বর আমাদেরকে মুক্তি দেন । মানুষ যদি মুক্তি পাওয়ার মতো কর্ম না করে, ঈশ্বর প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে কাউকে মুক্তি দেন না, গীতাকে গ্রহণ করলেই কেবল মানুষ এই মুক্তি পেতে পারে, তাই গীতার এক নাম মুক্তিগেহিনী ।

১১. অর্ধমাত্রা

যদিও গীতার জ্ঞান সম্পূর্ণ, কিন্তু শুধুমাত্র গীতা পড়ে কোনো মানুষ সনাতন ধর্মের সমস্ত কিছু বুঝে উঠতে পারবে না, যেহেতু গীতা হলো সমস্ত শাস্ত্রের সার বা সারমর্ম; কোনোকিছুর সারমর্ম পড়ে যেমন মানুষ সেই বিষয় সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা লাভ করতে পারে, বিস্তারিত ধারণা নয়, তেমনি গীতা পড়েও মানুষ সনাতন ধর্মের সবকিছুকে বুঝে উঠতে পারবে না, মোটামুটি অর্ধেক ধারণা লাভ করতে পারবে । কিন্তু সনাতন ধর্মের সকল তত্ত্বকে বুঝতে হলে গীতায় দেওয়া ইঙ্গিতগুলোকে ধরে সনাতন ধর্মীয় অন্যান্যগ্রন্থগুলোও পড়তে হবে এবং কিছু বিষয় বুঝতে এবং অভ্যাস করতে তত্ত্বদর্শী গুরুরও শরণ নিতে হবে । কিন্তু যেহেতু কেউ শুধুমাত্র গীতা পড়েই সনাতন ধর্মের অর্ধেক তত্ত্ব বুঝে যেতে পারে, এজন্যই গীতাকে অর্ধমাত্রা বলা হয়েছে, যেহেতু গীতা পড়েই সনাতন ধর্মের অর্ধেক জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হয় । বাকি অর্ধেক হয় সনাতন ধর্মীয় অন্যান্য শাস্ত্র পড়ে এবং তত্ত্বদর্শী গুরুর সেবা করে, তার কাছ থেকে প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান লাভ করে ।

১২. চিতানন্দা

হৃদয়, মন বা চিত্তের আনন্দ দায়িনী বলে স্ত্রীলিঙ্গে গীতার একটি নাম চিতানন্দা ।

১৩. ভবঘ্নী

ভব অর্থ ইহলোকের সংসার বা মায়ার জগৎ, আর ঘ্ন অর্থ হত্যা বা ধ্বংস করা । ভব+ ঘ্ন+ ঈ= ভবঘ্নী, সুতরাং ভবঘ্নী শব্দের অর্থ জগতের মায়াকে বিনাশকারী, যে মায়া নিজের মন থেকে বিনাশ না হলে জন্মান্তর থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না বা মোক্ষ লাভ করা যায় না । গীতা যেহেতু মোক্ষ প্রদানকারী গ্রন্থ, সেহেতু গীতার এক নাম ভবঘ্নী ।

১৪. ভ্রান্তিনাশিনী

একজন ভ্রান্ত পথিক কখনো তার সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না । কিন্তু জীবন যেহেতু আত্মার ভ্রমণ এবং আত্মার লক্ষ্য হলো এই জন্মান্তর থেকে মুক্তি পেয়ে মোক্ষ লাভ করা, তাই জীবাত্মার ভ্রান্তিকে নাশ করে তাকে সঠিক পথে চলতে এবং তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে বলেই গীতার একটি নাম ভ্রান্তিনাশিনী ।

১৫. বেদত্রয়ী

বেদ তিনটি, যথা- ঋক, সাম ও যজুঃ । এই তিন বেদের সার গীতার মধ্যে উপস্থিত বলেই গীতার একটি নাম বেদত্রয়ী ।

১৬. পরানন্দা

গীতা পাঠে শুধু নিজেই নয়, যে শ্রবণ করে তাকেও আনন্দ দেয় এজন্যই গীতার একটি নাম পরানন্দা।

১৭. তত্ত্বার্থ

গীতা হলো সকল শাস্ত্রের সার বা তত্ত্ব, তাই গীতার একটি নাম তত্ত্বার্থ ।

১৮. জ্ঞানমঞ্জরী

গীতার প্রতিটা তত্ত্ব জ্ঞানে ভরপুর, এজন্য গীতার একটি নাম জ্ঞানমঞ্জরী ।

কোনো কিছুর নাম- সেটা ব্যক্তি হোক বা বস্তু হোক বা গ্রন্থ হোক- খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, ঐ নাম দ্বারাই প্রাথমিকভাবে বোঝা যায় যে বিষয়টি কী এবং তা কোন বিষয়কে ধারণ করেছে । গীতার ১৮টি নাম বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গীতার বিভিন্ন বিষয়কে প্রকাশ করে, যা উপরের আলোচনা দ্বারা আমার পাঠক বন্ধুদেরকে বোঝাতে পেরেছি বলে আমি মনে করছি ।


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
Post a Comment (0)
To Top