| ধামরাই রথযাত্রা |
৪০০ বছরের ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহামিলন: ধামরাইয়ের শ্রীশ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা
ঢাকায় থেকেও যারা ধামরাইয়ের রথের কথা শোনেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার! কার্তিক-অগ্রহায়ণে যেমন নবান্নের ঘ্রাণ, ঠিক তেমনি আষাঢ়ের গুরুগম্ভীর মেঘের সাথে ধামরাইবাসীর মনে বেজে ওঠে রথযাত্রার আনন্দ-ঝংকার। এটি কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কোনো ধর্মীয় আচার নয়; বরং ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে আমাদের ধামরাইয়ের হাজার বছরের কৃষ্টি, সংস্কৃতি আর প্রাণের উৎসব। ঢাক-ঢোলের শব্দ, কাঁসরের আওয়াজ আর হাজারো মানুষের "হরিবোল" ধ্বনিতে মুখরিত ধামরাইয়ের এই ঐতিহাসিক রথযাত্রার শেকড় কিন্তু লুকিয়ে আছে আজ থেকে প্রায় চারশত বছর গভীরে।
আজকে আমরা ডুব দেবো ধামরাই রথের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, অলৌকিক উপাখ্যান, উত্থান-পতন আর বর্তমানের গল্পে।
রাজা যশোপাল ও শ্রীশ্রী যশোমাধবের অলৌকিক আত্মপ্রকাশ
ধামরাই রথযাত্রার সূচনা যার হাত ধরে, তিনি হলেন রাজা যশোপাল। লোকমুখে প্রচলিত গল্প আর ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, একদিন রাজা যশোপাল হাতিতে চড়ে ধামরাই এলাকার পাশ্ববর্তী এক গ্রামে ভ্রমণে বের হয়েছিলেন।
চলতে চলতে হঠাৎ এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল! একটি সাধারণ মাটির ঢিবির সামনে এসে রাজার হাতিটি ঠায় দাঁড়িয়ে গেল। রাজা শত চেষ্টা করলেন, মাহুত তার অঙ্কুশ দিয়ে আঘাত করল, কিন্তু হাতি এক চুলও নড়ল না। অবাক রাজা তখন হাতি থেকে নেমে স্থানীয় গ্রামবাসীদের ডেকে ওই মাটির ঢিবিটি খনন করার নির্দেশ দিলেন।
কী পাওয়া গেল সেই ঢিবির নিচে?
খননকাজ শেষ হতেই সবার চোখ চড়কগাছ! মাটির নিচে লুকিয়ে ছিল একটি প্রাচীন মন্দির এবং বেশ কিছু চমৎকার কষ্টিপাথরের মূর্তি। যার মধ্যে শ্রীবিষ্ণুর মূর্তির অবিকল রূপ ধারণ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বয়ং শ্রীমাধব।
রাজা পরম ভক্তিতে মূর্তিগুলো সাথে নিয়ে আসেন। পরে ধামরাই সদরের 'ঠাকুরবাড়ি' এলাকার পঞ্চাশ গ্রামের বিশিষ্ট পণ্ডিত শ্রীরামজীবন রায়ের ওপর এই মাধব মূর্তির সেবা-পূজার ভার দেওয়া হয়। রাজা যশোপালের নামের সাথে মিলিয়ে এই বিগ্রহের নামকরণ করা হয় "শ্রীশ্রী যশোমাধব"। সেই থেকে আজ অবধি ধামরাইয়ের যশোমাধব আঙিনায় নিত্য পূজা চলে আসছে, আর একে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বিশ্বখ্যাত এই রথযাত্রা ও মেলা।
বাঁশের রথ থেকে গগনচুম্বী কাঠের প্রাসাদ: বিবর্তনের ইতিহাস
সুদীর্ঘ ৩৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই রথযাত্রা সাড়ম্বরে পালিত হয়ে আসছে। তবে শুরুর দিকে রথটি কেমন ছিল? ইতিহাস বলে, একদম শুরুতে এটি ছিল একটি সাধারণ বাঁশের তৈরি রথ। কালের পরিক্রমায় কীভাবে যে তা বিশাল কাঠের রথে রূপ নিল, তার নিখুঁত তারিখ জানা না গেলেও এর পেছনে রয়েছে ঢাকা জেলার সাটুরিয়ার বালিয়াটির জমিদারদের বিশাল অবদান। বাংলা ১২০৪ - ১৩৪৪ সন এর মধ্যে বংশানুক্রমে বালিয়াটির জমিদাররা এখানে একে একে চারটি দৃষ্টিনন্দন কাঠের রথ তৈরি করেন।
১৩৪৪ বঙ্গাব্দে (ইংরেজি ১৯৩৭ সালের দিকে) এই রথ পুনর্নির্মাণের দায়িত্ব পান নারায়ণগঞ্জের বিখ্যাত ঠিকাদার স্বর্গীয় সূর্য নারায়ণ সাহা। ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া ও সিংগাইর থেকে আসা নামী-দামী কাঠশিল্পীদের যৌথ ছোঁয়া লেগেছিল এই রথ তৈরিতে। প্রায় এক বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তৈরি হয় ৬০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন এক ত্রিতল রথ।
- প্রথম ও দ্বিতীয় তলা: চার কোণে চারটি সুসজ্জিত প্রকোষ্ঠ বা ঘর।
- তৃতীয় তলা: চূড়ায় দেবতার জন্য প্রধান একটি প্রকোষ্ঠ।
সাধারণত রথযাত্রা উৎসর্গ করা হয় জগৎপতি জগন্নাথদেবের উদ্দেশ্যে। কিন্তু আমাদের ধামরাইয়ের বিশেষত্ব হলো, এখানে রথ টানা হয় স্বয়ং যশোমাধব বা শ্রীবিষ্ণুর স্মরণে, যা একে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।
১৯৭১-এর কালো রাত এবং ঐতিহ্যের ভস্মীভবন
ইতিহাসের পাতায় ১৯৭১ সাল যেমন আমাদের স্বাধীনতার সূর্য এনে দিয়েছিল, তেমনি ধামরাইবাসীর বুকে দিয়ে গিয়েছিল এক গভীর ক্ষত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা ধামরাইয়ের এই ঐতিহ্যবাহী, কারুকার্যখচিত ৭৫ ফুট উচ্চতা এবং ৪৪ ফুট প্রস্থের মূল কাঠের রথটি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
শুধু রথ পোড়ানোই নয়, ধামরাই রথযাত্রার অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক, মির্জাপুরের মহান দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা (আর পি সাহা) এবং তাঁর পুত্রকে পাকিস্তানি বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
কিন্তু ধামরাইয়ের মানুষের চেতনাকে কি এত সহজে পুড়িয়ে মারা যায়? যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেই, ১৯৭২ সালে রণদা প্রসাদ সাহার সুযোগ্য কন্যা শ্রীমতী জয়াপতি এবং স্থানীয় সমাজসেবক ঠাকুর গোপাল বণিকের হাত ধরে আবার রথযাত্রা শুরু হয়—প্রাথমিকভাবে আবারও সেই আদি বাঁশের রথ দিয়েই। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে সবার সম্মিলিত চেষ্টায় আবার একটি কাঠের রথ নির্মিত হয়।
ভারতের উপহার: বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রথ
২০০৬ সালে ধামরাইয়ের রথোৎসবে বিশেষ অতিথি হিসেবে আসেন তৎকালীন ভারতীয় হাই কমিশনার শ্রীমতী বীণা সিক্রী। ধামরাইবাসীর দীর্ঘদিনের আবেগের দাবি শুনে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর পুড়িয়ে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক রথের আদলেই নতুন রথ নির্মাণে ভারত সরকার সহায়তা করবে।
যেমন কথা, তেমন কাজ! ২০০৯ সালে তৎকালীন ভারতীয় হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী এবং শ্রীশ্রী যশোমাধব মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) জীবন কানাই দাস একটি ঐতিহাসিক চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। দীর্ঘ এক বছরের নকশা ও নির্মাণকাজ শেষে যৌথভাবে UDC এবং Calvin Tecno Touch কোম্পানি তৈরি করে বর্তমানের মনোরম রথটি।
২০১০ সাল থেকে যে রথটি দিয়ে উৎসব হচ্ছে, তার উচ্চতা ৩৭ ফুট। এটি বর্তমানে সচল রথগুলোর মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রথ হিসেবে বিবেচিত!
রথযাত্রার দিনলিপি: কেমন হয় উৎসবের সেই ৯ দিন?
ধামরাইয়ের রথ মানেই এক মহোৎসব। নির্দিষ্ট তিথিতে ভোরবেলা ভারতেশ্বরী হোমসের শিল্পীদের কণ্ঠে ভোর-আরতি ও ভক্তিগীতির সুরে যশোমাধবকে জাগরণ করার মাধ্যমে মন্দিরের দ্বার উন্মোচন করা হয়।
- বিকেল ৪:০০ টা: মূল মন্দির থেকে যশোমাধবসহ অন্যান্য দেব-দেবীর বিগ্রহ নিয়ে আসা হয় রথখোলায় (যেখানে সারা বছর রথটি রাখা থাকে)।
- বিকেল ৪:৩০ টা: অস্থায়ী মঞ্চে আলোচনা সভা শেষে প্রধান অতিথি পুরোহিতের হাতে প্রতীকী রশি প্রদানের মাধ্যমে রথটানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
- মহামিলনের ক্ষণ: লাখো ভক্ত নর-নারী পাটের তৈরি বিশাল রশি ধরে কায়তপাড়া রথখোলা থেকে রথ টেনে নিয়ে যান প্রধান সড়ক দিয়ে পৌর এলাকার গোপনগরে (যাকে বলা হয় মাধবের শ্বশুরালয় বা মাসির বাড়ি)।
এখানেঃ দুর্গা পূজা পদ্ধতি pdf ডাউনলোড করুন
এখানেই রথটি টানা ৯ দিন অবস্থান করে। এই ৯ দিন ধামরাই মেলা প্রাঙ্গণে বসে নানা রঙের পসরা। জিলাপি, খৈ-মুড়কি থেকে শুরু করে কুটির শিল্পের তৈজসপত্র। ৯ দিন পর আসে উল্টো রথযাত্রা। সেদিন বিকেল ৬টায় একইভাবে রথ টেনে আবার কায়তপাড়ার মূল রথখোলায় ফিরিয়ে আনা হয়।
বর্তমান সংকট: ঐতিহ্যের আঙিনায় আইনি জটিলতা
আজকের ধামরাই রথযাত্রা কেবল উৎসবের আলোয় মোড়ানো নয়, এর পেছনে রয়েছে এক অধিকার আদায়ের লড়াইও। ধামরাই মৌজার যাত্রাবাড়ী এলাকায় মাধবের দ্বিতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে যশোমাধবের নামে প্রায় ১৬৭ শতাংশ জমি রয়েছে। কোনো বৈধ দলিল ছাড়াই এসএ (SA) ও আরএস (RS) রেকর্ডে স্থানীয় ভূমি প্রশাসন এই ঐতিহ্যবাহী সম্পত্তিকে 'সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত' করে ফেলে।
দুর্ভাগ্যবশত, এই মন্দির প্রাঙ্গণেরই প্রায় ৮ শতাংশ জমি ঢাকা জেলা প্রশাসন দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা দিয়ে বসে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ তীব্র প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করেছেন।
যেহেতু বিষয়টি এখন আদালতে বিচারাধীন, তাই আইনি নিষ্পত্তি হওয়ার আগে এই জমি ইজারা দেওয়া জেলা প্রশাসনের মোটেও উচিত হয়নি। আইনের শাসন বজায় রাখতে এবং ধামরাইয়ের শত বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে এই বিতর্কিত ইজারা বাতিল করাই সবার জন্য মঙ্গলজনক।
ধামরাই রথযাত্রার মূল শিক্ষাই হলো সাম্য ও মহামিলন। যখন রথের রশি টানা হয়, তখন কে ধনী, কে দরিদ্র, কে কোন ধর্মের বা জাতের—সেই বৈষম্য ঘুচে যায়। সবাই এক হয়ে রশি টেনে এগিয়ে নিয়ে যায় রথটিকে। এই সম্প্রীতির সুরই ধামরাইয়ের আসল সৌন্দর্য। আমাদের জাতীয় দায়িত্ব এই ৪০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যকে রক্ষা করা এবং এর পবিত্রতা ধরে রাখা।
আপনার কি কখনো ধামরাইয়ের রথযাত্রায় আসার সুযোগ হয়েছে? রথের মেলার কোন জিনিসটি আপনার সবচেয়ে প্রিয়? কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন!
ধামরাইয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আরও জানতে ভিজিট করতে পারেন বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন এর অফিশিয়াল পেইজে।
