রমা একাদশী মাহাত্ম্য

0

রমা একাদশীর মাহাত্ম্য

একদিন মহারাজ যুধিষ্ঠির মহারাজ শ্রীকৃষ্ণকে বললেন-হে জনার্দন । কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীর নাম ও মাহাত্ম্য কৃপা করে আমায় বলুন ।

শ্রীকৃষ্ণ বললেন-হে মহারাজ । মহাপাপ দুরকারী সেই একাদশী ‘রমা’ নামে বিখ্যাত । আমি এখন এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি, আপনি তা মনোযোগ সহকারে শবণ করুন ।

পুরাকালে মচুকুন্দ নামে একজন সুপ্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন । দেবরাজ ইন্দ্র, যম, বরুণ ও ধনপতি কুবেরের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল । ভক্তশ্রেষ্ঠ বিভীষণের সাথেও তার অত্যন্ত সম্ভাব ছিল ।

আরো জানুনঃ একাদশীর পারণ মন্ত্র

তিনি ছিলেন বিষ্ণুভক্ত ও সত্যপ্রতিজ্ঞ। এইরূপে তিনি ধর্ম অনুসারে রাজ্যশাসন করতেন ।চন্দ্রভাগা নামে তার একটি কন্যা ছিল । চন্দসেনের পুত্র শোভনের সাথে তার বিবাহ হয়েছিল । শোভন একসময় শ্বশুর বাড়িতে এসেছিল । দৈবক্রমে সেইদিন ছিল একাদশী তিথি ।

রমা একাদশী মাহাত্ম্য

স্বামীকে দেখে পতিপরায়ণা চন্দ্রভাগা মনে মনে চিন্তা করতে লাগল । হে ভগবান! আমার স্বামী অত্যন্ত দুর্বল, তিনি ক্ষুধা সহ্য করতে পারেন না । এখানে আমার পিতার শাসন খুবই কঠোর । দশমীর দিন তিনি নাগরা বাজিয়ে ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, একাদশী দিনে আহার নিষিদ্ধ ।

আমি এখন কি করি! রাজার নিষেধাজ্ঞা শুনে শোভন তার প্রিয়তমা পত্নীকে বলল- হে প্রিয়ে, এখন আমার কি কর্তব্য, তা আমাকে বলো । উত্তরে রাজকন্যা বলল- হে স্বামী, আজ এই গৃহে এমনকি রাজ্যমধ্যে কেউই আহার করবে না ।

মানুষের কথা তো দূরে থাকুক পশুরা পর্যন্ত অন্নজল মাত্র গ্রহণ করবে না । হে নাথ, যদি তুমি এ থেকে পরিত্রাণ চাও তবে নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন কর । এখানে আহার করলে তুমি সকলের নিন্দাভাজন হবে এবং আমার পিতাও ক্রুদ্ধ হবেন । এখন বিশেষভাবে বিচার করে যা ভাল হয়, তুমি তাই কর । সাধ্বী স্ত্রীর এই কথা শুনে শোভন বলল- হে প্রিয়ে! তুমি ঠিকই বলেছ । কিন্তু আমি গৃহে যাব না ।

এখানে থেকে একাদশী ব্রত পালন করব । ভাগ্যে যা লেখা আছে তা অবশ্যই ঘটবে । এইভাবে শোভন ব্রত পালনে বদ্ধপরিকর হলেন । সমস্ত দিন অতিক্রান্ত হয়ে রাত্রি শুরু হল । বৈষ্ণবদের কাছে সেই রাত্রি সত্যিই আনন্দকর । কিন্তু শোভনের পক্ষে তা ছিল বড়ই দুঃখদায়ক ।

কেননা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় সে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ল । এভাবে রাত্রি অতিবাহিত হলে সূর্যোদয়কালে তার মৃত্যু হল । রাজা মুচুকুন্দ সাড়ম্বরে তার শবদাহকার্য সুসম্পন্ন করলেন । চন্দ্রভাগা স্বামীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাপ্ত করে পিতার আদেশে পিতৃগৃহেই বাস করতে লাগল । কালক্রমে রামব্রত প্রভাবে শোভন মন্দরাচল শিখরে অনুপম সৌন্দর্যবিশিষ্ট এক রমণীয় দেবপুরী প্রাপ্ত হলেন।

একসময় মচুকুন্দপুরের সোমশর্ম্মা নামে এক ব্রাহ্মণ তীর্থভ্রমণ করতে করতে সেখানে উপস্থিত হলেন । সেখানে রত্নমন্ডিত বিচিত্র স্ফটিকখচিত সিংহাসনে রত্নালঙ্কারে ভূষিত রাজা শোভনকে তিনি দেখতে পেলেন । গন্ধর্ব ও অস্পরাগণ দ্বারা নানা উপচারে সেখানে তিনি পূজিত হচ্ছিলেন ।

রাজা মুচুকুন্দের জামাতারুপে ব্রাহ্মণ তাকে চিনতে পেরে তার কাছে গেলেন । শোভনও সেই ব্রাহ্মণকে দেখে আসন থেকে উঠে এসে তাঁর চরণ বন্দনা করলেন। শ্বশুর মচুকুন্দ ও স্ত্রী চন্দ্রভাগা সহ নগরবাসী সকলের কুশলবার্তা জিজ্ঞাসা করলেন ।

ব্রাহ্মণ সকলের কুশল সংবাদ জানালেন । জিজ্ঞাসা করলেন-এমন বিচিত্র মনোরম স্থান কেউ কখনও দেখেনি । আপনি কিভাবে এই স্থান প্রাপ্ত হলেন, তা সবিস্তারে আমার কাছে বর্ণনা করুন । শোভন বললেন যে, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষীয়া রমা একাদশী সর্বব্রতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ । আমি তা শ্রদ্ধারহিতভাবে পালন করলেও তার আশ্চর্যজনক এই ফল লাভ করেছি। আপনি কৃপা করে চন্দ্রভাগাকে সমস্ত ঘটনা জানাবেন ।

সোমশর্ম্মা মচুকুন্দপুরে ফিরে এসে চন্দ্রাভাগার কাছে সমস্ত ঘটনার কথা জানালেন । ব্রাহ্মণের কথা শুনে অত্যন্ত আনন্দিত চন্দ্রভাগা বললেন- হে ব্রাহ্মণ! আপনার কথা আমার কাছে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে । তখন সোমশর্ম্মা বললেন- হে ব্রাহ্মণ! আপনার কথা আমার কাছে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে ।

তখন সোমশর্ম্মা বললেন- হে পুত্রী, সেখানে তোমার স্বামীকে আমি স্বয়ং সচক্ষে দেখেছি । অগ্নিদেবের মতো দীপ্তিমান তার নগরও দর্শন করেছি । কিন্তু তার নগর স্থির নয়, তা যাতে স্থির হয় সেই মতো কোন উপায় কর । এসব কথা শুনে চন্দ্রভাগা বললেন, তাকে দেখতে আমার একান্ত ইচ্ছা হচ্ছে ।

আমাকে এখনই তার কাছে নিয়ে চলুন । আমি ব্রত পালনের পুণ্যপ্রভাবে এই নগরকে স্থির করে দেব । তখন সোমশর্ম্মা চন্দ্রভাগাকে নিয়ে মন্দার পর্বতে বামদেবের আশ্রমে উপনীত হলেন । সেখানে এক ঋষির কৃপায় ও হরিবাসর ব্রত পালনের ফলে চন্দ্রভাগাকে নিয়ে মন্দার ও হরিবাসর ব্রত পালনের ফলে চন্দ্রভাগা দিব্য শরীর ধারণ করল । দিব্য গতি লাভ করে নিজ স্বামীর নিকট উপস্থিত হলেন ।

প্রিয় পত্নীকে দেখে শোভন অতীব আনন্দিত হলেন । বহুদিন পর স্বামীর সঙ্গ লাভ করে চন্দ্রভাগা অকপটে নিজের পুণ্যকথা জানালেন । হে প্রিয়, আজ থেকে আট বছর আগে আমি যখন পিতৃগৃহে ছিলাম তখন থেকেই এই রমা একাদশীর ব্রত নিষ্ঠাসহকারে পালন করতাম । 

ঐ পুণ্য প্রভাবে এই নগর স্থির হবে এবং মহাপ্রলয় পর্যন্ত থাকবে । হে মহারাজ ! মন্দারাচল পর্বতের শিখরে শোভন স্ত্রী চন্দ্রভাগা সহ দিব্যসুখ ভোগ করতে লাগলেন । পাপনাশিনী ও ভুক্তিমুক্তি প্রদায়িনী রমা একাদশীর মাহাত্মা আপনার কাছে বর্ণনা করলাম । যিনি এই একাদশী ব্রত শ্রবণ করবেন, তিনি সর্বপাপ মুক্ত হয়ে বিষ্ণুলোকে পূজিত হবেন ।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
Post a Comment (0)
To Top