হিন্দুধর্মের দশবিধ সংস্কার কি ? এর গুরুত্ব কতখানি ?

0

হিন্দুধর্মের দশবিধ সংস্কার কি ? এর গুরুত্ব কতখানি ?

Table Of Content (toc)

জন্ম ও জন্ম পরবর্তী সংস্কার বা দশবিধ সংস্কার

ধর্মীয় রীতি-নীতি ও ঐতিহ্য অনুসরণ করে সমগ্রজীবনে যেসব মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান পালন করা হয়, সেগুলোই সংস্কারগুলো পূর্ণাঙ্গরূপে লেখা আছে ।

জন্ম ও জন্ম পরবর্তী সময়ে প্রত্যেক সনাতন ধর্মাবলম্বীর জন্য পালনীয় কিছু বিধি-বিধান আছে । এগুলোকে দশবিধ সংস্কার বলা হয় । এসবের মধ্যে রয়েছে-গর্ভাধান, পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন, জাতকর্ম, নামকরণ, অন্নপ্রাশন: বিদ্যারম্ভ, চূড়াকরণ, উপনয়ন, সমাবর্তন বিবাহ । বৈদিক যুগে এ সকল সংস্কার পালিত হলেও এখনকার সময়ে দশবিধ সংস্কারের সবগুলো সমানভাবে পালিত হয় না । এখন যে সকল সংস্কার পালিত হয় তাদের মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলোঃ

সীমন্তোন্নয়ন

গর্ভধারণের পর চতুর্থ, ষষ্ঠ বা অষ্টম মাসে নিরাপদ প্রসবের আকাঙ্ক্ষায় এই সংস্কার পালন করা হয় । বর্তমানে এই সংস্কার সাধ-ভক্ষণ বা সাধ নামে বেশি পরিচিত ।

জাতকর্ম

সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিতা যব, যষ্টিমধু ও ঘৃত দ্বারা সন্তানের জিহ্বা স্পর্শ করে মন্ত্রোচ্চারণ করেন ।

নামকরণ

সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার দশম, একাদশ, দ্বাদশ বা শততম দিনে নামকরণ করতে হয় ।

নিষ্ক্রমণ

নিষ্ক্রমণ অর্থ 'বাইরে যাওয়া' । এই অনুষ্ঠানে বাবা-মা শিশুকে বাইরে নিয়ে যান । এ সময়ে শিশুটি প্রথমবারের মতো বাইরের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হয় । জন্মের পর চতুর্থ মাসে এটি পালন করার নিয়ম । শিশুকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক পরানো হয় । তাকে বাইরে নিয়ে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, চাঁদ বা সূর্য দেখানো হয় ।

অন্নপ্রাশন

শিশুর প্রথম খাবার খাওয়া উপলক্ষে যে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান হয়, তাকে অন্নপ্রাশন বলে । একে আমরা 'মুখে ভাত' হিসেবেও জানি । পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে যষ্ঠ বা অষ্টম মাসে এবং কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে পঞ্চম বা সপ্তম মাসে এই অনুষ্ঠান হয় । অন্নপ্রাশনে আত্মীয়, প্রতিবেশীরা নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসে শিশুকে আশীর্বাদ করেন, উপহার দেন ।

অন্নপ্রাশনের পর বিদ্যারম্ভ নামে আরেকটি সংস্কার প্রচলিত আছে ।

বিদ্যারম্ভ

ছোট শিশুদের জ্ঞান, অক্ষর এবং শেখার প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অনুষ্ঠান । শিশু চার বছর অতিক্রম করলে পঞ্জিকা দেখে বিদ্যারম্ভের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা হয় । এরপর পূজা-অর্চনা হয় । শিশুকে হাতে ধরে অক্ষর লেখানো হয় । এই সংস্কার 'হাতেখড়ি' নামেই বেশি পরিচিত। সাধারণত সরস্বতী পূজার সময় শিশুদের হাতেখড়ি অনুষ্ঠান করা হয় ।

চূড়াকরণ

গর্ভাবস্থায় সন্তানের মাথায় যে চুল হয়, কেটে ফেলার তা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান । উপনয়ন সংস্কার থাকলে এটি উপনয়নের সময় নতুবা অন্নপ্রাশনের সময়ে সম্পন্ন করা হয় ।

এই সংস্কারের সঙ্গে কর্ণভেদ নামে একটি অতিরিক্ত সংস্কারের উল্লেখ আছে ।

কর্ণভেদ

কর্ণভেদ অর্থ 'কানে ছিদ্র করা'। এই সংস্কার মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি পালন করতে দেখা যায়। 'উপনয়ন' সংস্কারে চূড়াকরণের পর কর্ণভেদের বিধান আছে ।

উপনয়ন

উপনয়ন সংস্কারে বিদ্যাশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীকে প্রথমে গুরুর কাছে নিয়ে যাওয়া হয় । 'উপনয়ন' শব্দটির মানে 'কাছে নিয়ে যাওয়া' । প্রচলিত একটি অর্থে উপনয়ন বলতে বোঝায় যজ্ঞোপবীত বা পৈতা ধারণ ।

সমাবর্তন

লেখাপড়া শেষে গুরু যখন শিষ্যকে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেন তখন একটি উৎসব হয় । এটিই সমাবর্তন । আগেকার দিনে উপনয়ন শেষে গুরুগৃহে বাস করাই ছিল রীতি। সেখানে লেখাপড়া শেষ করে গুরুর অনুমতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হতো ।

বর্তমানে গুরুগৃহে থেকে বিদ্যাশিক্ষার প্রচলন নেই । সে কারণে এ সংস্কারটি এখন আর পালিত হয় না, তবে 'সমাবর্তন' নামটি আছে । বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্র বিতরণ উৎসব এখন 'সমাবর্তন' নামে উদ্যাপিত হয় । এখনকার সময়ে যারা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাদের উপাধিপত্র (সার্টিফিকেট) প্রদান উৎসবের সঙ্গে আগেকার গুরুগৃহ ত্যাগের উৎসবের তুলনা করা যেতে পারে ।

বিবাহ

বিবাহ শব্দের অর্থ বিশেষরূপে ভার বহন করা । প্রাপ্তবয়সে বেদ ও পিতৃপুজা, হোম ইত্যাদির মাধ্যমে মন্ত্র উচ্চারণ করে একজন ছেলে ও একজন মেয়ের জীবনকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার সংস্কারকে বিবাহ বা বিয়ে বলা হয়। এর মাধ্যমে পরিবার গড়ে ওঠে । পরিবারের সকলে মিলেমিশে সুখ-দুঃখ ভাগ করে, একে অপরকে সহযোগিতা করে জীবন যাপন করে ।

বিবাহে যেমন কতকগুলো শাস্ত্রীয় বিধি-বিধান পালিত হয়, তেমনি পালিত হয় কতকগুলো লৌকিক ও স্থানীয় আচার ।

মনুসংহিতায় বিভিন্ন রকমের বিবাহ পদ্ধতির বর্ণনা আছে । এর মধ্যে ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য উল্লেখযোগ্য । বর্তমান সমাজে ব্রাহ্ম বিবাহই বেশি প্রচলিত ও স্বীকৃত । বাবা-মা মেয়েকে নতুন কাপড় ও অলংকারে সাজিয়ে, আমন্ত্রিত অতিথি ও আত্মীয় স্বজনকে সাক্ষী রেখে, বরের কাছে কন্যাদান করেন। একে ব্রাহ্মবিবাহ বলে । আবার প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত সমাজে গান্ধর্ব বিবাহেরও প্রচলন আছে । নারী-পুরুষ পরস্পরের প্রতি শপথ করে মাল্য বিনিময়ের মাধ্যমে যে বিবাহ করে, তাকে বলা হয় গান্ধর্ব বিবাহ । বিবাহের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্ত্রটি হলো-

"যদিদং হৃদয়ং তব তদন্তু হৃদয়ং মম।

যদিদং হৃদয়ং মম, তদন্তু হৃদয়ং তব।” (ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণ)

অর্থাৎ তোমার এই হৃদয় হোক আমার, আমার হৃদয় হোক তোমার ।

বিবাহের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গভীর প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা থাকে । তারা একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথি হয়ে জীবনের পথে নতুন যাত্রা শুরু করে ।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
Post a Comment (0)
To Top