শ্রীকৃষ্ণের মাথায় ময়ূরের পালক থাকে কেন ?

0
শ্রীকৃষ্ণের মাথায় ময়ূরের পালক থাকে কেন ?

শ্রীকৃষ্ণের মাথায় ময়ূরের পালক থাকে কেন ?

এ সম্পর্কে যে গল্পটি পাওয়া যায়, সেটা হলো- রাম অবতার হিসেবে বিষ্ণু যখন ত্রেতাযুগে আবির্ভূত হন এবং যখন তিনি ১৪ বছরের জন্য স্বেচ্ছা বনবাস নেন, সেই সময় বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে জলতৃষ্ণায় ক্লান্ত হয়ে গেলে ময়ূর নাকি পথ দেখিয়ে কোনো এক সরোবরের কাছে নিয়ে যায় এবং সেই সরোবরের জল পান করে রাম লক্ষ্মণ সীতা নিজদের তৃষ্ণা নিবারণ করে। সেই সময় রাম, ঐ ময়ূরকে কথা দেন, দ্বাপরে যখন তিনি আবার পৃথিবীতে আবির্ভূত হবেন, তখন, ময়ূররা যেন মানুষের কাছে সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাখি হয়, তেমন কোনো কাজ করবেন।

এর পর দ্বাপরে বিষ্ণু, কৃষ্ণ রূপে আবির্ভূত হন। তো বাল্যকালে একদিন তিনি বনের পাশে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন, সেই বাঁশির সুরে মোহিত হয়ে বনের সকল ময়ূর এসে তাঁর আশেপাশে নাচতে শুরু করে, এভাবে অনেকক্ষণ নাচার পর এমন আনন্দজনক নাচ শেষ হলে, ময়ূরদের সর্দার এসে কৃষ্ণকে বলে- আপনার বাঁশির সুরে নেচে আমরা এমন আনন্দ লাভ করেছি যে আর কখনো এমন আনন্দ পাই নি। আমাদেরকে এমন আনন্দ দানের জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমাদের একটি পালক আপনাকে নিবেদন করছি, যদি আপনি তা আপনার মাথায় ধারণ করেন তো আমরা ধন্য হবো। এই ঘটনার পর পূর্বজন্মের রাম হিসেবে কোনো এক ময়ূরের কাছে করা প্রতিজ্ঞাকে স্মরণ করে কৃষ্ণ ঐ পালক গ্রহন করে এবং নিজের মাথায় ধারণ করে।

এসব শুধুই গল্প, এসবের সত্য মিথ্যা প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই। তাই জানতে চাইলে এগুলো শুধু শুনতে হবে, কিন্তু এসব সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।

মানুষ অনেক কিছুই করে থাকে বাস্তব কারণে, সেই সব কিছুর পেছেন যে কোনো না কোনো গল্প থাকতে হবে এমন কোনো বিষয় নয়; যেমন- শ্রীকৃষ্ণ সর্বদা হলুদ রং এর পোষা্ক পরতেন, এখন যদি কেউ প্রশ্ন করে যে শ্রীকৃষ্ণ কেনো হলুদ রং এর পোশাক পরতেন, এই প্রশ্নের উত্তর তো আর গল্প বলে দেওয়া সম্ভব নয়।

শ্রীকৃষ্ণের হলুদ রং এর পোশাক পরার একটি কারণ হতে পারে, জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে হলুদ রং হলো বৃহস্পতির রং, আর বৃহস্পতি হলো জ্ঞান ও সুখের কারক বা প্রতীক। এই কারণেও শ্রীকৃষ্ণ সর্বদা হলুদ রং এর পোশাক পরতে পারেন, যেহেতু তিনি সর্বজ্ঞানী।

ময়ূরের পাখায় সাতটি রং থাকে, যার মাধ্যমে ময়ূর প্রকৃতির সকল রংকে ধারণ করে। শ্রীকৃষ্ণের মাথায় ময়ূর পালক ধারণের এটাও একটা অর্থ যে শ্রীকৃষ্ণ প্রকৃতির সকল রং অর্থাৎ ভালো মন্দ শুভ অশুভ সকল কিছুর ধারক।

সাধারণভাবে সমাজে একটি গল্প প্রচলিত আছে যে- ময়ূর কামনা শূন্য প্রাণী, তারা কখনো যৌনক্রিয়া করে না, পুরুষ ময়ূর যখন নাচে, তখন তার দেহে যে ঘাম উৎপন্ন হয়, সেই ঘাম পান করে ময়ূরী গর্ভবতী হয়, কিন্তু বাস্তবে এটা একটা ডাহা মিথ্যা প্রচার। ময়ূর মুরগী জাতীয় প্রাণী, কিন্তু এরা সারা বছর ধরে মুরগীর মতো স্বাধীনতা পালন করে না, ময়ূরের প্রজনন কাল হলো বর্যাকাল, এই সময় ময়ূরেরা প্রজনন করে থাকে এবং সেই সিজনে এক একটি ময়ূরী গড়ে ২৫টি করে ডিম দেয়, সেই ডিম থেকেই ময়ূরের বাচ্চা হয়, কিন্তু বাচ্চা অবস্থাতেই ময়ূরের অমন সুন্দর পালক গজায় না, ময়ূরের পালক গজাতে থাকে ছয় মাস বয়স থেকে। বাংলাদেশের গাজীপুর জেলায় বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে প্রচুর ময়ূর আছে, বর্ষাকালে সেখানে গেলে শুধু ময়ূরই দেখতে পাবেন না, ময়ূরের মিলন দৃশ্যও দেখতে পেতে পারেন। এ প্রসঙ্গে আরেকটি তথ্য দিয়ে রাখি, ময়ূর তার পেখম মেলে নাচে শুধু যৌন মিলনের উদ্দেশ্যে ময়ূরীকে আকর্ষণ করার জন্যই। যে ময়ূর তার পেখম মেলে সবচেয়ে ভালো নাচে এবং যে দেখতে সবচেয়ে সুন্দর, তার প্রতিই ময়ূরীরা আকৃষ্ট হয় এবং তার সাথেই যৌন মিলন করে।

ময়ূরের পাখার কিছু আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে, সেই আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও শ্রীকৃষ্ণ তার মাথায় ময়ূর পালক ধারণ করতে পারেন। জ্যোতিষ শাস্ত্রমতে বাড়িতে কোনোভাবে অশুভ বা নেগেটিভ শক্তির প্রবেশ ঘটলে বাড়িতে নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হয়; যেমন- পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মনোমালিন্য, ঝগড়াঝাটি হয়, ছেলে মেয়ে অবাধ্য হয়, আর্থিক উন্নতি বাধাপ্রাপ্ত হয়, এককথায় সংসারে সুখ থাকে না; এই সব সমস্যার সমাধানে জ্যোতিষ শাস্ত্রের নির্দেশ মতো বাড়ির বিভিন্ন স্থানে ময়ূরের পালক রাখলে কিছু শুভ ফল পাওয়া যায়। এসব নিয়ে ইউটিউবে অনেক ভিডিও আছে, 'ময়ূরের পালকের গুনাগুন' লিখে সার্চ দিলেও সেগুলো পেয়ে যাবেন, সেগুলো দেখে এই নলেজটা প্রয়োজন হলে নেবেন। ওগুলো লিখে এই পোস্টটাকে আমি আর বড় করতে চাইছি না।

ময়ূর হলো যোদ্ধা পাখি, যে কারণে দেবসেনাপতি কার্তিকের সাথে ময়ূর থাকে। আসলে ময়ূর কার্তিকের চলার পথের বাহন নয়, যেটা আমরা সাধারণভাবে জেনে এসেছি। ময়ূর যেহেতু পাখিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, সেহেতু দেবতাদের মধ্যে কার্তিকও যে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, সেটা বোঝাতেই কার্তিকের সাথে ময়ূর দেওয়া হয়েছে; তাই ময়ূর কার্তিকের বাহক নয়, কার্তিকের বিশেষ তথ্যের বাহক। এছাড়াও ময়ূর পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাণী, এই ময়ূরের পালক মাথায় ধারণ করে শ্রীকৃষ্ণ এই তথ্য আমাদেরকে দিয়েছেন যে- তিনি যেমন সবচেয়ে সুন্দর, তেমনি তিনি শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাও। বাস্তবেও শ্রীকৃষ্ণ শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, তিনি কখনো কোনো পরিস্থিতিতেই কারো সাথে যুদ্ধে পরাজিত হন নি, সেটা শিশু বা বালক অবস্থায় রাক্ষসদের সাথে যুদ্ধ হোক বা কংসের সাথে লড়াইয়ে হোক।

শ্রীকৃষ্ণ হলুদ পোশাক পরিধান করে যেমন আমাদেরকে এই তথ্য দিয়েছেন যে- তিনি জ্ঞানী, তেমনি তিনি মাথায় ময়ূরের পালক পরিধান করেও আমাদেরকে এই তথ্য দিয়েছেন যে- তিনি শুধু সুন্দরই নন, তিনি শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাও; মানুষের পোশাক পরিচ্ছদে তার মনের ভাব ফুটে উঠে; যেমন- যে মেয়ে মডেলিং করার স্বপ্ন দেখে, সে সব সময় সেই ধরণের আল্ট্রা মডার্ন পোশাকই পছন্দ করবে বা পরবে, আর কখনোই বোরকা পরবে না। কিন্তু যে মেয়ে বোরকা পরবে সে কখনো মডেলিং করার কথা ভাববে না।

আবার যারা সুর পছন্দ করে, তারা দেবতা; আর যারা সুর পছন্দ করে না, তারা অসুর। বাস্তব পৃথিবীতে মুসলমানরা অসুর এই কারণেই যে তারা সুর পছন্দ করে না; কারণ, যেহেতু ইসলামে গান বাজনা নিষেধ। শ্রীকৃষ্ণের হাতের বাঁশি হলো সুরের প্রতীক, তাই শ্রীকৃষ্ণের হাতের বাঁশি আমাদেরকে এই তথ্য দেয় যে- তিনি অসুর নন, দেবতা।

কোনো মানুষ কী বা কী ধরণের, সেটা অপরজনকে সহজে বোঝানোর উপায় হলো তার পোশাক পরিচ্ছদ, এই জন্যই শ্রীকৃষ্ণ হাতে বাঁশি রাখেন, হলুদ পোশাক পরিধান করেন এবং মাথায় ময়ূরের পালক ধারণ করেন। এখন এই বিষয়গুলো কী কারণে শ্রীকৃষ্ণ গ্রহণ করেছেন, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নানা জনে নানা গল্প তৈরি করেছে, যেগুলো সত্য হতে পারে বা নাও হতে পারে, যেহেতু এগুলো  মহাভারত বা হরিবংশে পাওয়া যায় না, এগুলো লোকগাঁথার মতো শুধু শোনা যায়, কিন্তু এই গল্পগুলোর কোনো সোর্স কেউ বলে না বা বলতে পারে না। তাই এই ধরণের ব্যাখ্যাকে সযতনে এড়িয়ে রেখে আমরা এটা মনে করতে পারি যে- শ্রীকৃষ্ণ তার স্বরূপকে বোঝানোর জন্যই হাতে বাঁশি, পরণে হলুদ পোশাক এবং মাথায় ময়ূরের পালক ধারণ করেন, এর অন্য কোনো ব্যাখ্যায় নিজেকে ডোবানোর প্রয়োজন নেই।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
Post a Comment (0)
To Top