সফলা একাদশী মাহাত্ম্য

1
সফলা একাদশী মাহাত্ম্য

সফলা একাদশীর মাহাত্ম্য | সফলা একাদশী 2023

আর্টিকেলটি 'একাদশী মাহাত্ম্য' পুস্তক থেকে নেওয়া হয়েছে ।

পৌষ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীর নাম ‘সফলা’ । ব্রহ্মাণ্ডপুরাণে যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণ সংবাদে এই তিথির মাহাত্ম বর্ণিত হয়েছে । যুধিষ্ঠির বললেন—হে প্রভু! পৌষ মাসের কৃষ্ণপক্ষীয়া একাদশীর নাম, বিধি এবং পূজ্যদেবতা বিষয়ে আমার কৌতুহল নিবারণ করুন। শ্রীকৃষ্ণ বললেন-হে মহারাজ! আপনার প্রতি স্নেহবশত সেই ব্রত কথা বিষয়ে বলছি । এই ব্রত আমাকে যেরকম সন্তুষ্ট করে, বহু দানদক্ষিণাযুক্ত যজ্ঞাদি দ্বারা আমি সেরকম সন্তুষ্ট হই না । তাই যত্নসহকারে এই ব্রত পালন করা কর্তব্য ।

পৌষ মাসের কৃষ্ণপক্ষীয়া একাদশীর নাম ‘সফলা'। নাগদের মধ্যে যেমন শেষনাগ, পক্ষীদের মধ্যে গরুড়, মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ, দেবতাদের মধ্যে নারায়ণ সর্বশ্রেষ্ঠ; তেমনই সকল ব্রতের মধ্যে একাদশী ব্রতই সর্বশ্রেষ্ঠ । হে মহারাজ! যারা এই ব্রত পালন করেন, তারা আমার অত্যন্ত প্রিয় । তাদের এজগতে ধনলাভ ও পরজগতে মুক্তি লাভ হয় । হাজার হাজার বছর তপস্যায় যে ফল লাভ হয় , একমাত্র সফলা একাদশীতে রাত্রি জাগরণের ফলে তা অনায়াসে প্রাপ্ত হওয়া যায় ।

মহিষ্মত নামে এক রাজা প্রসিদ্ধ চম্পাবতী নগরে বাস করতেন । রাজার চারজন পুত্র ছিল। কিন্তু তার জ্যেষ্ঠ পুত্র লুম্ভক সর্বদা পরস্ত্রীগমন, মদ্যপান প্রভৃতি অসৎ কার্যে রত ছিল । সে সর্বক্ষণ ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণবদেবতাদের নিন্দা করত । পুত্রের এই আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে রাজা তাকে রাজ্য থেকে বার করে দিলেন । স্ত্রী-পুত্র, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন পরিত্যক্ত হয়ে সে এক গভীর বনে প্রবেশ করল । সেখানে কখনও জীবহত্যা আবার কখনও চুরি করে জীবন ধারণ করতে লাগল । কিছুদিন পরে একদিন সে নগরে প্রহরীদের কাছে ধরা পড়ল । কিন্তু রাজপুত্র বলে সেই অপরাধ থেকে সে মুক্তি পেল । পুনরায় সে বনে ফিরে গিয়ে জীবহত্যা ও ফলমূল আহার করে দিন যাপন করতে লাগল ।

ঐ বনে বহু বছরের পুরানাে একটি বিশাল অশ্বথ বৃক্ষ ছিল । সেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিরাজমান বলে বৃক্ষটি দেবত্ব প্রাপ্ত হয়েছে । সেই বৃক্ষতলে পাপবুদ্ধি লুম্ভক বাস করত । বহুদিন পর তার পুর্বজন্মের কোন পুণ্য ফলে সে পৌষ মাসের দশমী দিনে কেবল ফল আহারে দিন অতিবাহিত করল । কিন্তু রাত্রিতে অসহ্য শীতের প্রকোপে সে মৃতপ্রায় হয়ে রাত্রিযাপন করল । পরদিন সূর্যোদয় হলেও সে অচেতন হয়েই পড়ে রইল । দুপুরের দিকে তার চেতনা ফিরল । ক্ষুধা নিবারণের জন্য সে অতিকষ্টে কিছু ফল সংগ্রহ করল । এরপর সেই বৃক্ষতলে এসে পুনরায় বিশ্রাম করতে থাকল । রাত্রিতে খাদ্যাভাবে সে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ল । সে প্রাণরক্ষার্থে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ফলগুলি নিয়ে—‘হে ভগবান! আমার কি গতি হবে’ বলে অশ্রুপাত করতে করতে সেই বৃক্ষমূলে, “হে লক্ষ্মীপতি নারায়ণ! আপনি প্রসন্ন হােন’ বলে নিবেদন করল । এইভাবে সে অনাহারে ও অনিদ্রায় সেই রাত্রি যাপন করল ।

ভগবান নারায়ণ সেই পাপী লুম্ভকের রাত্রি জাগরণকে একাদশীর জাগরণ এবং ফল অর্পণকে পূজা বলে গ্রহণ করলেন । এইভাবে অজ্ঞাতসারে লুম্ভকের সফলা একাদশী ব্রত পালন হয়ে গেল । প্রাতঃ কালে আকাশে দৈববাণী হল—হে পুত্র, তুমি সফলা ব্রতের পুণ্য প্রভাবে রাজ্য প্রাপ্ত হবে । সেই দৈববাণী শােনামাত্র লুম্ভক দিব্যরূপ লাভ করল । তার পাপবুদ্ধি দূর হল । সে পুনরায় নিষ্কণ্টক রাজ্য লাভ করল। স্ত্রীপুত্রসহ কিছুকাল রাজ্যসুখ ভােগের পর পুত্রের ওপর রাজ্যের ভার দিয়ে সে সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করল। অবশেষে মৃত্যুকালে সে অশােক অভয় ভগবানের কাছে ফিরে গেল ।

হে মহারাজ! এভাবে সফলা একাদশী যিনি পালন করেন, তিনি জাগতিক সুখ ও পরে মুক্তি লাভ করেন । এই ব্রতে যারা শ্রদ্ধাশীল, তারাই ধন্য । তাদের জন্ম সার্থক, এতে কোন সন্দেহ নেই । এই ব্রত পাঠ ও শ্রবণে মানুষের রাজসূয় যজ্ঞের ফল লাভ হয় ।


আরও পড়ুন :

হিন্দু ধর্মের বাণী

হিন্দুরা কেন মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে ?

হিন্দুরা কেন গোমাংস ভক্ষণ করে না ?

বিজয়া একাদশী মাহাত্ম্য কথা

মহাভারত বাংলায় কে অনুবাদ করেন ?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
To Top