বাংলাদেশে দুর্গাপূজার একাল ও সেকাল
বন্ধুরা, আসছে দুর্গাপূজো । শারদীয়া দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ । এটি মা দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উৎসব যিনি নারীশক্তির প্রতীক হিসেবে অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে শুভ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । এই পূজাকে অকালবোধন বলা হয়, কারণ প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এটি দেবতাদের নিদ্রার সময়ে অনুষ্ঠিত হয় ।
অকালবোধনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, ভগবান শ্রীরাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল । হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, এই সময়টি দেবতাদের পূজার জন্য যথাযথ নয়, কারণ তারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই পূজাকে অকালবোধন বা অকালের পূজা বলা হয় । এই পুরাণগুলোয় উল্লেখ আছে যে, ভগবান রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেন । অন্যদিকে, কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর রামায়ণে লিখেছেন যে, শ্রীরাম স্বয়ং এই পূজা করেছিলেন । তবে মূল বাল্মীকির রামায়ণে বা অন্যান্য অনুবাদে এর কোনো উল্লেখ নেই ।
হংস নারায়ণ ভট্টাচার্য মনে করেন অকালবোধন আসলে বৈদিক যজ্ঞের একটি আধুনিক রূপায়ণ । সনাতন ধর্মে পূজার মূল ভিত্তি হলো মন্ত্র, যা এই উৎসবে শ্রী শ্রী চণ্ডী থেকে পাঠ করা হয় । ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল এবং সংস্কৃত মন্ত্রের সমন্বয়ে এক পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি হয় ।
দেবী দুর্গার স্বরূপ: অসুরবিনাশী থেকে স্নেহময়ী জননী
আমাদের বাঙালি হিন্দুদের কাছে দেবী দুর্গা একই সঙ্গে অসুরবিনাশী এবং মমতাময়ী মাতা । তিনি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন, যা অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিপরীতে ন্যায় ও শুভশক্তির জয়ের প্রতীক । তিনি কেবল সৌন্দর্য, মমতা ও সৃজনের আধারই নন, অসহায় ও নিপীড়িতদের আশ্রয়ও বটে ।
শ্রী শ্রীঠাকুর বলেছেন, পূজাপার্বণ কেবল ফুল, তুলসী বা গঙ্গাজলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক অনুশীলনী কৌশল এর মাধ্যমে ফল দেয় । তাই দুর্গাপূজা কেবল পুস্পবিল্বপত্র ও ঢাক-ঢোলের উৎসব নয়, এটি মানবতার এক বিরাট মিলন উৎসব । শ্রী শ্রীঠাকুর আরও বলেছেন, মা সবারই মা, কাউকে ছেড়ে দিয়ে নয় । তিনি জীবজগতের একত্বের প্রতীক । মা যেমন সব সন্তানের নাড়িছেঁড়া ধন, তেমনি সন্তানেরাও মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও সেবা দিয়ে পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারে ।
পূজার গভীর অর্থ: বোধন থেকে বিসর্জন
দুর্গাপূজার প্রতিটি অংশের একটি গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে ।
- বোধন: বোধন মানে জাগরণ বা চেতন করে তোলা । বিল্ববৃক্ষে এই বোধন হয়। শ্রী শ্রীঠাকুরের মতে, ‘বোধন মানে বোধসূত্র, যাকে আশ্রয় করে অন্তরে বাহিরের যা কিছুকে বুঝে সুঝে চলতে পারা যায় ।’ বিবেক জাগ্রত না হলে বিশ্ব মানবতার সন্তান হওয়া যায় না ।
- পূজা: পূজা মানে সংবর্ধনা । যার পূজা করা হয়, তার মহনীয় গুণাবলিকে নিজের চরিত্রে ধারণ করা এবং তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করা ।
- বলি: বলি শব্দের উৎপত্তি ‘বল্’ ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘বর্দ্ধন’ । এর প্রকৃত অর্থ হলো নিজেদের হিংস্রতা ও লালসাকে উৎসর্গ করা । এটি নিষ্ঠুর পশুহত্যার পরিবর্তে নিজেকে বলীয়ান করে তোলার একটি প্রতীকী রূপ ।
- বিসর্জন: বিসর্জন এসেছে ‘বি-সৃজ’ ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘বিশেষ প্রকারে সৃষ্টি করা’ । এর তাৎপর্য হলো মায়ের সর্বমঙ্গলকারিণী চরিত্রকে নিজের অন্তরে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করা এবং মায়ের সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করা ।
দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপ ও নাম
দুর্গা বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমনঃ মহামায়া, মহাকালী, মহালক্ষ্মী, মহাসরস্বতী, শ্রী চণ্ডী । তিনি ‘সর্বশক্তি স্বরূপিনী আদ্যাশক্তি’ । দুর্গা নামটি এসেছে দুর্গ নামের এক দৈত্যকে বধ করার কারণে । শত্রু বিনাশে তিনি যেমন ভয়ঙ্করী, তেমনি ভক্তদের কাছে তিনি স্নেহময়ী জননী । আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায়ঃ
‘ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে বাঁ হাত করে শঙ্কা হরণ । দুই নয়নে স্নেহের হাসি ললাট নেত্র আগুণবরণ ।’
দুর্গাপূজার ঐতিহাসিক উৎপত্তি ও বিবর্তন
দুর্গাপূজার প্রথম প্রচলন নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে । ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃদেবীর পূজা প্রচলিত ছিল, যা পরে আর্য সভ্যতায় দেবদেবীর প্রাধান্যের মধ্যেও টিকে থাকে । সিন্ধু সভ্যতায় এই মাতৃপূজা আরও বিস্তার লাভ করে ।
- পৌরাণিক মত: ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে, দুর্গাপূজার প্রথম প্রবর্তক ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ । দ্বিতীয়বার ব্রহ্মা এবং তৃতীয়বার মহাদেব । দেবী ভাগবত পুরাণ মতে, ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু এই পূজা করে বর লাভ করেন ।
- প্রাচীন ইতিহাস: মার্কন্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী, চেদী রাজবংশের রাজা সুরথ ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কলিঙ্গে ‘দশেরাহ’ নামে দুর্গাপূজা শুরু করেন । নেপালেও এই পূজা ‘দশেরাইন’ নামে পরিচিত ।
- মধ্যযুগের বাংলা: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে দুর্গাপূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায় । কৃত্তিবাসী রামায়ণে শরৎকালে রামচন্দ্রের দুর্গাপূজা করার বিষয়টি উল্লেখ আছে । এই পূজায় ১০১টি নীল পদ্ম ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা যায় ।
আধুনিক দুর্গাপূজার সূচনা
আধুনিক দুর্গাপূজার সূচনা মূলত ব্যক্তিগত ও জমিদার পরিবারগুলোর হাত ধরে হয় । ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে দিনাজপুরের জমিদার, ১৬শ শতকে রাজশাহীর রাজা কংশ নারায়ণ, ১৫১০ সালে কোচবিহারের রাজা বিশ্ব সিংহ, এবং ১৬১০ সালে কলকাতার সুবর্ণ রায় চৌধুরী এই পূজার প্রচলন করেন ।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব লর্ড ক্লাইভের সম্মানে দুর্গাপূজার মাধ্যমে বিজয় উৎসবের আয়োজন করেন । ১৮ শতকে জমিদার এবং বড় ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই পূজা আরও জনপ্রিয়তা লাভ করে। বর্তমানে এই পূজা পারিবারিক এবং সর্বজনীন ‘বারোয়ারি পূজা’ হিসেবে উদযাপিত হয় ।
দুর্গাপূজার সময়কাল ও বিশেষ আচার
দুর্গাপূজা সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয় । এই দিনগুলো যথাক্রমে দুর্গাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত । এই পুরো সময়টি ‘দেবীপক্ষ’ নামে পরিচিত, যা মহালয়া থেকে শুরু হয়ে কোজাগরী পূর্ণিমায় শেষ হয় ।
কুমারী পূজা: নারীশক্তির আরাধনা
দুর্গাপূজার একটি বিশেষ অংশ হলো কুমারী পূজা । দেবী পুরাণে এর সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এই পূজায় সাধারণত ১ থেকে ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কুমারীকে দেবী রূপে পূজা করা হয় । শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘শুদ্ধাত্মা কুমারীতে দেবী বেশি প্রকাশ পায় ।’
১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতার বেলুড় মঠে কুমারী পূজার পুনঃপ্রচলন করেন । হিন্দু সমাজে নারীর প্রতি অন্যায় ও নিপীড়ন রোধে নারীকে দেবীর আসনে সম্মানিত করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য । সেই থেকে প্রতি বছর অষ্টমীতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ।
সন্ধিপূজা: অশুভ বিনাশের সন্ধিক্ষণ
মহাষ্টমী ও মহানবমীর সংযোগকালে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা । এই সময়ে দেবী দুর্গাকে চামুণ্ডা রূপে পূজা করা হয় । এটি তান্ত্রিক মতে সম্পন্ন হয় এবং এই পূজায় দেবীকে ১৬টি উপাচার নিবেদন করা হয় । যদিও এই পূজায় পশুবলির বিধান রয়েছে, বাংলাদেশের দুর্গাপূজায় সাধারণত পশুবলি হয় না ।
মন্ত্র ও প্রণাম: ভক্তিমূলক নিবেদন
দুর্গাপূজার সময় আমরা ভক্তরা বিভিন্ন মন্ত্র পাঠ করে দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকি ।
- দুর্গা পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র: ‘ঔঁ জয়ন্তি মঙ্গলা কালী, ভদ্র কালী কপালিনী, দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী, স্বাহা স্বধা নমস্তুতে। এস স্ব চন্দন পুষ্প বিল্ব পত্রাঞ্জলী নম ভগবতী দুর্গা দেবী নমহ্।’
- দুর্গা প্রণাম মন্ত্র: ‘সর্ব মঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে শরণ্যে ত্রম্বকে গৌরি নারায়নী নমস্তুতে।’
এই মন্ত্রের অর্থ হলো, ‘হে দেবী সর্বমঙ্গলা, শিবা, সকল কার্য সাধিকা, শরণযোগ্য, গৌরি ত্রিনয়ণী, নারায়ণী তোমাকে নমস্কার ।’
সবাইকে দুর্গাপূজার অগ্রিম শারদীয় শুভেচ্ছা!